বিদেশগামি যাত্রীদের করোনা পরীক্ষার ফি, এক দেশে দুই নীতি

বিদেশগামী যাত্রীদের করোনা নমুনা পরীক্ষায় উচ্চ হারে ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি হাসপাতাল থেকে নমুনা পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত হলেও তাদের গুনতে হচ্ছে বেসরকারি হাসপাতালের জন্য ধার্য করা ফির সমান টাকা। অর্থাৎ সরকার নির্ধারিত হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে নমুনা পরীক্ষা করালেও প্রত্যেককে সাড়ে তিন হাজার টাকা দিতে হবে। বাড়ি গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করা হলে দিতে হবে সাড়ে চার হাজার টাকা। বেসরকারি হাসপাতালে করোনার নমুনা পরীক্ষার ক্ষেত্রে এ পরিমাণ ফি ধার্য করা আছে।

বর্তমানে সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে নমুনা পরীক্ষার ক্ষেত্রে ২০০ টাকা এবং বাড়ি গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করলে ৫০০ টাকা দিতে হয়।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের কাছে গত ১৬ জুলাই স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে পাঠানো এক চিঠিতে বিদেশগামী যাত্রীদের করোনার নমুনা পরীক্ষার জন্য বেসরকারি হাসপাতালের সমান ফি নির্ধারণের কথা জানানো হয়। গতকাল সোমবার থেকে দেশের ১৬টি প্রতিষ্ঠানে একযোগে নমুনা সংগ্রহ শুরু হয়েছে। এর আগে সরকারি হাসপাতাল বা প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে এ নমুনা পরীক্ষা হয়ে আসছিল। ফি ধার্য করার পর নমুনা পরীক্ষার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। লক্ষণ-উপসর্গ থাকার পরও অসচ্ছল ও দরিদ্র মানুষ নমুনা পরীক্ষা করাচ্ছেন না। ফি আরোপের কারণে নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা কমে যাওয়ার কথা নিয়মিত স্বাস্থ্য বুলেটিনে উল্লেখও করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা।

সরকারি প্রতিষ্ঠানে নমুনা পরীক্ষার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য বিভাগের দুই রকম ফি নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মহামারির এই সময়ে এমন দ্বৈতনীতি জনমনে ক্ষোভ বাড়াবে বলে মনে করেন সংশ্নিষ্টরা। স্বাস্থ্য বিভাগের এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের অভিমত, বিদেশগামী ব্যক্তিদের অধিকাংশই শ্রমিকশ্রেণির। বছরের পর বছর ধরে বিদেশে কাজ করে টাকা পাঠিয়ে তারা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছেন। কাজে ফিরতে ওইসব দেশে যেতে এখন তাদের করোনা নেগেটিভ সনদের প্রয়োজন। ওই সনদের জন্য তাদের কাছ থেকে উচ্চহারে ফি আদায় অনাকাঙ্ক্ষিত। এতে করে এসব মানুষ ও তাদের পরিবারের মধ্যে ক্ষোভ বাড়বে। তাছাড়া রাষ্ট্র তার নাগরিকদের জন্য দ্বৈতনীতি গ্রহণ করতে পারে না। এটি সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত, নাকি কোনো ব্যক্তিবিশেষের চিন্তার ফল- তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।

এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মহিবুল হক বলেন, নমুনা পরীক্ষার ফি নির্ধারণের বিষয়টি বিমান মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারে নেই। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে ফি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। নমুনা পরীক্ষাও তাদের আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে হবে।
বাড়তি ফি আরোপের বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নজরে এনেছিলেন কিনা- এমন প্রশ্নে মহিবুল হক বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে বিষয়টি তিনি জানতে চেয়েছিলেন।
পিসিআর কিটের স্বল্পতা ও উচ্চমূল্য- এ দুটির সমন্বয় করতে গিয়ে ওই ফি নির্ধারণ করা হয়েছে বলে স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে তাকে জানানো হয়েছে।
সম্প্রতি করোনা নেগেটিভ সনদ নিয়ে ইতালিতে যাওয়া ৩৬ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হওয়ার পর বাংলাদেশের সঙ্গে এক সপ্তাহের জন্য বিমান যোগাযোগ বন্ধ ঘোষণা করে দেশটির সরকার।

সরকারি ১৬ প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত হলো যেভাবে : করোনার ভুয়া নেগেটিভ সনদ বাণিজ্য রোধে আন্তর্জাতিক রুটে চলাচলকারী এয়ারলাইন্সগুলোর কর্তৃপক্ষ নমুনা পরীক্ষার জন্য সরকারের কাছে দেশের ২৯টি সরকারি-বেরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব করে। বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় ওই তালিকা স্বাস্থ্য বিভাগে পাঠায়। সেখান থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ১৬টি সরকারি প্রতিষ্ঠানকে বিদেশগামী যাত্রীদের করোনার নমুনা পরীক্ষার জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছে। এগুলো হলো- বরিশালের শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রামের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশন ডিজিজেস, কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ, ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টার, ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথ (আইপিএইচ) ও ন্যাশনাল ইনস্টটিউট অব প্রিভেন্টিভ অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিন (নিপসম), নারায়ণগঞ্জ তিনশ’ শয্যা হাসপাতাল, খুলনা মেডিকেল কলেজ, কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ, বগুড়া জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ, দিনাজপুরের এম আবদুর রহিম মেডিকেল কলেজ, রংপুর মেডিকেল কলেজ এবং সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ। বিদেশগামী যাত্রীদের নির্ধারিত এই প্রতিষ্ঠানগুলো থেকেই করোনার নমুনা পরীক্ষা করতে হবে।

নমুনা পরীক্ষা শুরু :বিদেশগামী বাংলাদেশের নাগরিকদের করোনার নমুনা পরীক্ষা গতকাল সোমবার থেকে শুরু হয়েছে। ঢাকায় বসবাসকারীদের মহাখালীর উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মার্কেটে অবস্থিত কভিড-১৯ আইসোলেশন কেন্দ্রে নমুনা সংগহ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ঢাকার বাইরে ১৩ জেলায় সংশ্নিষ্ট সিভিল সার্জনের তত্ত্বাবধানে গতকাল থেকে নমুনা সংগ্রহ শুরু হয়েছে।
এদিকে যে প্রক্রিয়ায় বিদেশগামী যাত্রীদের নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে তাতে তাদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্নিষ্টরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিভিল সার্জন বলেন, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে বিদেশগামী যাত্রীরা যেভাবে নমুনা সংগ্রহ বুথের কাছে ভিড় করছেন তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এতে পজিটিভ ব্যক্তির সংস্পর্শে গিয়ে সুস্থ ব্যক্তিরও করোনা সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ফলে পরীক্ষায় নেগেটিভ আসা ব্যক্তিও বিদেশে গিয়ে পুনরায় পরীক্ষা করালে তার পজিটিভ আসার আশঙ্কা থাকবে। এতে করে সরকারের ভাবমূর্তি আরও ক্ষুণ্ণ হতে পারে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য তিনি নমুনা সংগ্রহের পরিধি বাড়ানোর পরামর্শ দেন।

দ্বৈতনীতি কাম্য নয়- মত বিশেষজ্ঞদের :নমুনা পরীক্ষার ফি নির্ধারণে দ্বৈতনীতি কাম্য নয় বলে মনে করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী করোনা সংক্রমণের পর দেশে আসা ব্যক্তিদের অধিকাংশই শ্রমিক শ্রেণির। বছরের পর বছর ধরে বিদেশে কাজ করে তারা বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন। করোনার দুর্যোগের কারণে অনেক দেশ এসব শ্রমিককে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে। বিভিন্ন দেশে করোনা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় আবার শ্রমিকদের ডাক পড়েছে। ওইসব দেশে প্রবেশ করতে হলে তাদের করোনা নেগেটিভ সনদ সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু তাদের পরীক্ষার ক্ষেত্রে যে ফি নির্ধারণ করা হয়েছে তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। কী কারণে বা কোন উদ্দেশ্যে এটি করা হয়েছে, তা সংশ্নিষ্টরাই ভালো বলতে পারবেন। এতে বিদেশগামী শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা মনোকষ্টে ভুগতে পারেন।
চিকিৎসকদের শীর্ষ সংগঠন বিএমএর সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব বলেন, একটি দেশের নাগরিকদের জন্য সরকার তো দুইরকম নীতি গ্রহণ করতে পারে না। বিদেশগামী যাত্রীদের সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার জন্য বাড়তি ফি কেন গুনতে হবে? তারা তো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নমুনা পরীক্ষা করাচ্ছেন না। বিদেশে চাকরি করে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা কি তাদের অপরাধ? না হলে এই বাড়তি ফি কেন?

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য :সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব আবদুল মান্নান গতকাল বলেন, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের চাহিদা অনুযায়ী স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় করোনার ফি নির্ধারণ করে দিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে। এরপর অর্থ মন্ত্রণালয়েরও অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। এখানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এককভাবে কিছু করেনি বলে জানান সচিব।